কুলিরাও এমন ভাষা ব্যবহার করেন না: হাইকোর্ট।

0
9

বাংলার রূপ

ডেস্ক রিপোর্টঃ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা জজের বিরুদ্ধে বিচার চলার সময় এজলাশ কক্ষে কিছু আইনজীবীর অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।

সোমবার (২৩ জানুয়ারি )ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সম্পাদকসহ ২১ আইনজীবী তলবে হাজির হওয়ার পর বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক-আল-জলিলের দ্বৈত বেঞ্চে প্রধান অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতাদের উপস্থিতিতে আদালত বলেন, ‘অশ্লীল স্লোগান! এগুলো কোনো ভাষা? কমলাপুরের কুলিরাও এমন ভাষা ব্যবহার করেন না। সমস্ত আইনজীবীর লজ্জা হওয়া উচিত। কালো এই খাকি পোশাকধারী কোনো ব্যক্তি এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারেনা।শ্রমিকদের মিছিলেও তো এ রকম স্লোগান দিতে দেখি না।কোনো রাজনৈতিক ভাষা, আন্দোলনের ভাষা? এত অশ্লীল!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা জজ শারমিন নিগারের নামে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান ও বিচারকাজ বিঘ্ন সৃষ্টি করার অভিযোগে গত ১০ জানুয়ারি জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদকসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি তাদের তলব করেন হাইকোর্ট। সে তলবে সোমবার তারা আদালতে হাজির হন।

আদালতে তাদের পক্ষে দাঁড়ান সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির, সম্পাদক আবদুন নূর, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ রাজা। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়।

শুনানির শুরুতে ২১ জনের পক্ষে আইনজীবী মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, ২১ জন হাজির হয়েছেন। আদালত অবমাননার আরেকটি বিষয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখ রয়েছে। দুটি রুলের একসঙ্গে শুনানি হোক।

আদালত বলেন, দুইটা ঘটনা এক না। ওইটা ছিল এক ধরনের ইনসিডেন্ট, এটা আরেক ধরনের ইনসিডেন্ট। ওইটা ছিল অ্যারোগেন্সি, বেয়াদবি। আর এটা হচ্ছে অশ্লীল। কোনো ভদ্রলোক, এসএসসি পাস করা লোকও এ রকমটা বলে না।

২১ জনের মধ্যে দুজন শিক্ষানবিশ আছেন উল্লেখ করে আদালত জানতে চান, তারা কারা? তখন দুজন মাস্ক পরে ডায়েসের সামনে আসলে আদালত তাদের মাস্ক খুলতে বলেন। এরপর আদালত তাদের নাম, কোন প্রতিষ্ঠান থেকে আইন পাস করেছেন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে কোন আইনজীবী অধীনে আছেন, তা জানতে চান। তখন একজন নিজেকে শফিকুল ইসলাম এবং আরেকজন কাজী ইকবাল নামে পরিচয় দিয়ে আদালতের প্রশ্নের উত্তর দেন।

এ সময় এ দুই শিক্ষানবিশ ও তাদের পক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশ্য করে আদালত বলেন, ‘অশ্লীল স্লোগান! এগুলো কোনো ভাষা? সমস্ত আইনজীবীর লজ্জিত হওয়া উচিত। কালো পোশাকধারী কোনো ব্যক্তি এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারে? শ্রমিকদের মিছিলেও তো এরকম স্লোগান দিতে দেখি না। এটা কোনো রাজনৈতিক ভাষা, আন্দোলনের ভাষা! এত অশ্লিল!

তখন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক আবদুন নূর দুলাল বলেন, সময় দেন (আদালত অবমাননা রুলের ব্যাখ্যা দিতে), তারপরে বিষয়টি আসুক।

আদালত বলেন, কি আসবে, আপনাদের দেখেও আমাদের লজ্জা লাগছে। গত দিনও সময় দিয়েছি। আজকেও সময় দিচ্ছি। কিন্তু আমরা খুবই চিন্তিত।

এ সময় মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, আমারও। জুডিশিয়ারি আমাদের সবার। মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

আদালত বলেন, তাই যদি হয়, যে গালি আপনারা (ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবীরা) দিয়েছেন, তা আপনার গায়েও লেগেছে।
তখন মোমতাজ উদ্দিন ফকির ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে কি ঘটেছে, কে স্লোগান দিয়েছে না দিয়েছে, দিয়ে থাকলে কি উদ্দেশ্য ছিল, তা দেখবেন বলে আদালতকে আশ্বস্ত করেন।

এ পর্যায়ে আদালত বলেন, বাংলাদেশের সমস্ত নিম্ন আদালতের গার্ডিয়ান সুপ্রিম কোর্ট। আমাদের দায়িত্ব আছে। আপনাদের সমস্যা, সুবিধা- অসুবিধা আপনারা বলতে পারেন। আপনাদের বিজ্ঞ বলে, আমাদেরও বিজ্ঞ বলে। বিজ্ঞের সঙ্গে ওই শব্দগুলো যায়?আদালত এ পর‌্যায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতের পরিস্তিতি জানতে চাইলে বার কাউন্সিলের সদস্য আইনজীবী মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোর্ট চলছে। বার কাউন্সিলের পক্ষ থেকে আগামী ২৮ তারিখে সাধারণ বর্ধিত সভা ডাকা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা থাকবেন। ওই সভা থেকে দেশের সমস্ত বারগুলোতে আমরা বার্তা দেব। তারপরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাব ইনশাল্লাহ।

তখন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনও রুলের ব্যাখ্যা দিতে আদালতকে সময় দিতে বলেন। এরপর আদালত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদককে ডায়াসের সামনে ডেকে নেন।

এরপর দুই শিক্ষানবিশের উদ্দেশ্যে আদালত বলেন, এই দুজন তো এখনো সনদই পাননি। এসব কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্ততায় তারা কোথায় যাবে? এদের ভবিষ্যৎ কী? যত দেরি হবে সবার ক্ষতি হবে। ওদেরকে বলে দিবেন ওদেরও ক্ষতি হবে।

তখন আইনজীবী মোহাম্মদ সাঈদ রাজা বলেন, ওরা ছিল না বলছে। এ সময় আদালত বলেন, কোর্টের যে বার্তা, তা বলবেন। আমরা ইচ্ছা করলে সর্বোচ্চ যেতে পারি। আজীবনের জন্য লাইসেন্স বাতিল করে দিতে পারি। বার কাউন্সিলের আচরণবিধির লঙ্ঘন, জাতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের লঙ্ঘন, আদালত অবমাননা তো আছেই। সুতরাং যেতে চাইলে আমরা অনেক যেতে পারি। তাদের কনডাক্ট, বিহেভিয়র…জুনিয়র। আর সারা ৬৪ জেলার বিষয় এটি। তাদের বার্তা দেবেন। এরপর আদালত রুলের ব্যাখ্যা দিতে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বেধে দেন।