বগুড়ার শেরপুরে শিকল বন্দি ময়নার টাকার অভাবে জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার‌ পথে

0
3
এজেড হীরা
শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ
বছরের পর বছর শত কষ্টের সীমা পেরিয়ে গেলেও  কষ্টের এ পথ থেকে যেন রেহাই   মিলছে না ময়নার।  তার উপর যেন  ভর করছে এক নির্মম নিষ্ঠুরতার খড়গ।  বাবা, মা, ছেলে মেয়েসহ চারপাশের সবাই যেন তার উপর হয়ে গেছে নির্মম উদাসীন ।  পিত্রালয়ের বাঁশের  খুটির শিকলটিই এখন হয়েছে তার একান্ত সঙ্গী।  শুকনো বাঁশের খুঁটির সাথে লড়াই করে  দিন-রাত থাকতে হচ্ছে বছরের পর বছর কাল ধরে। দুর্বিষহ জীবনের যন্রনা নিয়ে ময়নাকে অতিবাহিত করতে হচ্ছে দিন রাতের সময়।  সেসব দুঃখ বেদনার কথাও প্রকাশের শক্তি হারিয়ে ধুঁকে ধুঁকে  চিরসত্য মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছেন ময়না (৪০)। প্রায় ৭ বছর ধরে শিকল বন্দী হয়ে আছে পাগলি ময়না বেগম। ময়নার বৃদ্ধ বাবা ভ্যান চালিয়ে ৫ জনের সংসার চালায়। অথচ আজ পর্যন্ত একটি সরকারি ভাতার কার্ডও  ভাগ্যে জোটেনি  শিকল বন্দি ময়নার  কপালে।
সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের রামনগর মধ্যপাড়া গ্রামের আব্দুল হালিমের মেয়ে ময়না এর সঙ্গে একই ইউনিয়নের রামেশ্বরপুর  সামায়ন হোসেনের ছেলে আমিনুল ইসলামের সঙ্গে ১৫ বছর আগে বিয়ে হয়। ভালোই চলছিল তাদের দাম্পত্বের সংসার। সুখের  সংসারে জন্ম নেয় ছেলে মুন্নাফ (৯) এরপর হঠাৎ ময়নার মাথা ব্যাথা শুরু হয়।
 কিন্তু স্বামী আমিনুল ইসলাম স্ত্রী ময়নাকে  চিকিৎসা না করায় বাবার বাড়ীতে এসে চিকিৎসা করে ভালো হয়। সুখের সংসার করার জন্য আবার স্বামীর বাড়ীতে ফিরে যায়।
কিছুদিন  যেতে না যেতেই  আবার শুরু হয়তার  পাগলামীর মাত্রা। এরই মধ্যে জন্ম নেয় আরেকটি সুন্দরী নামের  মেয়ে সন্তান। এ র মাঝেই বাড়তে থাকে  মাথার সমস্যা , আর এ কারণেই অপারগ  স্বামী আমিনুল ইসলাম তাকে তালাক দিয়ে দেয়। চোখে মুখে অন্ধকারের ছাপ নিয়ে  ২ মাসের শিশু সুন্দরীসহ বৃদ্ধ বাবার বাড়ীতে আশ্রয় নেয় ময়না।
 বৃদ্ধ বাবা কিছুদিন চিকিৎসা করালেও টাকার অভাবে ময়নার চিকিৎসা  করাতে পারছেন না  ফলে বন্ধ হয়ে যায় তার চিকিৎসা কার্যক্রম।
চিকিৎসা বন্ধ হওয়ার পর থেকেই ময়না পুরো পাগলি হয়ে যায়। তখন শরীরে আর কোন কাপড় না রেখে রাস্তা ও এলাকার মাঝে ঘুরতে থাকে। এমন অবস্থায় বাবা আব্দুল হালিম ও মা ছয়েদা বেগম কোন উপায় না পেয়ে বাড়ীতে এনে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে। আর এই শিকল বাঁধা অবস্থায় পেঁরিয়ে গেছে ৭টি বছর। মেয়ে সুন্দরীর বয়স এখন সাত বছর। সুন্দরীর তেমন জ্ঞান, বুদ্ধি নেই। মাথার সমস্যা দেখা দিয়েছে। অর্থের অভাবে হয়তো আবার সুন্দরীকেও শিকল বন্দি জীবন কাঁটাতে হতে পারে বলে আশংকা করছেন তার দরিদ্র বর্তমান আভিভাবকেরা ।
ময়নার মা ছয়েদা বেগম জানান, ময়না এখন  সম্পূর্ণ পাগলি শরীরে কোন কাপড় রাখেনা। মেয়ে মানুষ এমন অবস্থায় বাহিরে ঘুরতে দেওয়া যায় না, তাই পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছি ৭ বছর যাবত। এই ৭ বছর ধরে এক জায়গায়তেই তার প্রকৃতির কাজ সারা হয়। আমিও তো আজ  বৃদ্ধা কোমড় সোজা করতে পারিনা, তবুও কষ্ট করে এগুলো পরিষ্কার করি। সে আমার মেয়ে, তাকে মেরে ফেলতে তো পারবোনা।
ময়নার বাবা আব্দুল হালিম জবাবদিহি কে জানান, ময়নার মেয়ে সুন্দরীরও এখন একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। মাঝে মাঝে নাতনী সুন্দরীও হারিয়ে যায়। তাকে দ্রুত চিকিৎসা না করলে একদিন সুন্দরীও পাগলি হয়ে যাবে। এই বৃদ্ধ বয়সে ভ্যান চালিয়ে চালাতে হয় ৫ জনের সংসার। তাকে চিকিৎসা করাবো এই টাকা পাবো কোথায়। বার বার মেম্বরের নিকট  একটি সরকারি ভাতার কার্ডের জন্য ধর্না দিয়েছি   আজও পাইনি।
গাড়ীদহ মডেল ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ড মেম্বর হামিদুর রহমান সরকার জানান, পনেরদিন হয়েছে সরকারি ভাতার কার্ডের জন্য আমার কাছে এসেছিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়েছি এখনো হাতে পায়নি।
গাড়ীদহ মডেল ইউনিয়নের  চেয়ারম্যান দবির উদ্দিন বলেন, আমার কাছে ময়নার বাবা ও মা কেউ এ সরকারি ভাতার জন্য আসেনি। তবে খোঁজ নিয়ে কার্ডের ব্যবস্হা করা হবে
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ময়নুল ইসলাম দৈনিক জবাবদিহি কে  বলেন আমি আপনাদের মাধ্যমে জানলাম, তাকে দেখতে যাবো এবং অতিদ্রুত সরকারি ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here