রৌমারীতে অপহরণসহ নানা অভিযোগ, তবুও বহাল তবিয়তে তহশিলদার।

0
28

এলাহী শাহরিয়ার নাজিম
রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধিঃ

একজনের জমি অন্যের নামে অবৈধভাবে বন্দোবস্ত, জবরদখলে সহযোগিতা, ভূমিহীন পরিবারের বসতভিটা অন্যের নামে বন্দোবস্ত, একই জমি একাধিকবার একই ব্যক্তির নামে নামখারিজ, অভিযোগকারীদের অপহরণ, ঘুষ ও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন রৌমারী উপজেলার সদর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) সাহাদৎ হোসেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক লিখিত অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রতিকার না হওয়ায় সাহাদৎ সিন্ডিকেটের কাছে এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন অভিযোগকারীরা।

সাহাদৎ চক্রের সর্বশেষ হয়রানির শিকার উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের জাবেদ আলী-হাফিজা বেগম নামের এক ভূমিহীন দম্পতি। টাকা নিয়েও কাজ না করার অভিযোগের শুনানির দিন এই দম্পতিকে অপহরণ করে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে সাহাদৎ চক্রের বিরুদ্ধে। তাদের লিখিত অভিযোগে বলা হয়, গত ৬ জুন সাহাদৎ’র বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগের শুনানি ছিল এসিল্যান্ড অফিসে। ওই দিন সকাল ১১টার দিকে অফিসের কাছাকাছি পৌঁছালে ভূমিহীন দম্পতি জাবেদ আলী-হাফিজা বেগমকে অপহরণ করেন তহশিলদার ও তার লোকজন। উপজেলা ভূমি অফিসের পাশেই কাঁচাবাজারের চারতলা ভবনের একটি কক্ষে প্রায় ২ ঘণ্টা আটকে রেখে তাদের ওপর চালানো হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ঘটনাটি জেলা প্রশাসন পর্যন্ত গড়ালে সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানভীর আহমেদ তাদের উদ্ধার করেন।

জাবেদ জানান, তাদের একমাত্র বসতভিটার ১৬ শতক জমি ভুল করে খাস খতিয়ানভুক্ত হয়। সেই জমিতে তারা ঘর তুলে বাবা-দাদার সময় থেকে বসবাস করছেন। ওই জমিটি ভূমি বন্দোবস্ত করে দেবেন বলে তাদের কাছ থেকে ৫৫ হাজার টাকা নেন তহশিলদার সাহাদৎ হোসেন। ১৬ শতক জমির মধ্যে ৯ শতক বন্দোবস্তও করে দেন। বাকি ৭ শতক জমি না পেয়ে টাকা ফেরত চেয়ে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি রৌমারী উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন তারা। অভিযোগের বিষয়ে জানতে পেরে কয়েক দিন পর ১৫ হাজার টাকা ফেরত দেন সাহাদৎ। বাকি টাকা ফেরতসহ অন্য ৭ শতক জমির দ্রুত নাম খারিজ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার কাছ থেকে একটি সাদা কাগজে টিপসই নেন তহশিলদার। দীর্ঘদিন ঘুরেও জমি খারিজ ও বাকি টাকা না পেয়ে গত ১২ এপ্রিল তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। পরে নোটিশের মাধ্যমে এসিল্যান্ড কার্যালয়ে ৬ জুন ডাকা হয় তাকে। ওই দিন স্ত্রীসহ তিনি উপজেলার থানা মোড়ে পৌঁছালে তহশিলদার সাহাদৎ হোসেনের নেতৃত্বে মাইদুল ইসলাম, আনিছুর রহমান মুক্তার, নজরুল ইসলাম, বাবু মিয়াসহ ১০-১২ জন তাদের দুজনকে তুলে নিয়ে গিয়ে প্রায় ২ ঘণ্টা আটকে রাখেন। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তারা উদ্ধার হন। ওই দিনই তহশিলদার সাহাদৎ হোসেনসহ ১০-১২ জনকে আসামি করে রৌমারী থানায় লিখিত অভিযোগ দেন তারা। শুধু জাবেদ দম্পতি নয়, তহশিলদার সাহাদতের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে স্থানীয় অনেকেই।

যাদুরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সরবেশ আলীর অভিযোগ, কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই, মাঠ জরিপ ছাড়াই যাদুরচর ইউনিয়ন পরিষদের নামে দলিল করা ও ভোগদখলে থাকা পুকুরের ৩০ শতক জমি অবৈধভাবে স্থানীয় পাঁচ ব্যক্তির নামে বন্দোবস্ত দেন তহশিলদার সাহাদৎ হোসেন ও সার্ভেয়ার আব্দুল আউয়াল। ভূমি অফিসের এই দুই কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ মদদে গত ৫ এপ্রিল রাত সাড়ে ৩টার দিকে ইউনিয়ন পরিষদের পুকুরপাড় জবরদখল করে পাঁচটি ছোট ঘর তোলেন বন্দোবস্ত নেওয়া ব্যক্তিরা। এ নিয়ে ৬ এপ্রিল সাহাদৎ, সার্ভেয়ার আব্দুল আউয়ালসহ সাতজনের বিরুদ্ধে রৌমারীর ইউএনও এবং থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।

উপজেলার সদর ইউনিয়নের বড়াইবাড়ি এলাকার রফিকুল ইসলাম নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, মায়ের নামে থাকা ১৬ শতক জমির নাম খারিজ করে দেবেন বলে সাহাদৎ তার কাছ থেকে দুই ধাপে সাড়ে ৬ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু নাম খারিজ করে দিচ্ছেন না। এক বছর ধরে ঘোরাচ্ছেন। মায়ের চিকিৎসার খরচ ও অভাবের কারণে জমিটি বিক্রি করা ছাড়া তার কোনো উপায় নেই জানিয়ে তিনি বলেন, নাম খারিজ না থাকায় জমিটি বিক্রি করতে পারছিনা।

যাদুরচর পূর্বপাড়া এলাকার ভূমিহীন আবু বক্কর মিয়া জানান, তার ভোগদখলে থাকা পৈতৃক বসতভিটার ১৫ শতক জমি অবৈধভাবে তিনজনের নামে বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন সাহাদৎ হোসেন।

একই এলাকার আবুল কালামের অভিযোগ, ৫৩ বছর ধরে তাদের ভোগদখল ও রেকর্ডিয় ১৩ শতক জমি যাচাই-বাছাই ও মাঠ জরিপ ছাড়াই টাকার বিনিময়ে ২০১৭ সালে একই এলাকার আবুল ফজল গংদের নামে খারিজ করে দেন সাহাদৎ। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি মিস কেস করলে আবুল ফজল গংদের নাম খারিজটি ২০২০ সালে বাতিল হয়। তবে একই বছর ওই জমিটি আবারও আবুল ফজল গংদের নামে খারিজ করে দেন সাহাদৎ। এ নিয়ে গত ২৮ জানুয়ারি তিনি সাহাদৎসহ আটজনকে আসামি করে রৌমারী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

আমজাদ হোসেন নামে আরেকজন বলেন, ‘তহশিলদার সাহাদতের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। হিসাব করলে পাহাড়সম অভিযোগ তার বিরুদ্ধে, কিন্তু তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করলে তার সিন্ডিকেটের সদস্যদের লেলিয়ে দেওয়া হয় অভিযোগকারীদের ক্ষতি করার জন্য। তহশিলদারের সিন্ডিকেটের কাছে সবাই অসহায়।

তহশিলদার সাহাদৎ হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আমার নামে সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমার সম্পর্কে যদি কিছু জানতে হয়, তবে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এসিল্যান্ড সাহেবের কাছে জানতে পারবেন।’ এই বলে তিনি মোবাইল সংযোগ কেটে দেন।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানভীর আহমেদের কাছে তহশিলদার সাহাদৎ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া নিয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে অস্বীকার করেন। পরে স্বীকার করলেও পত্রিকায় প্রতিবেদন না করার জন্য অনুরোধ করেন। অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি কেন লুকাতে চাচ্ছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তানভীর আহমেদ বলেন, ‘আমি মাত্র এক মাস আগে এখানে যোগদান করেছি। তহশিলদারের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। আমি এ অফিসের সব অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করার চেষ্টা করছি। আপনাদের সহযোগিতা চাই। আর আমার নাম বাদ দিয়ে রিপোর্ট করার অনুরোধ করছি।’

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান বলেন, ‘রৌমারী সদর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যতগুলো অভিযোগ পেয়েছি, সবগুলো নতুন যোগদানকারী এসিল্যান্ডকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here