কবি শঙ্খ ঘোষের মহাপ্রয়াণে বানারীপাড়ায় শোকের ছায়া।

0
7

রাহাদ সুমন,

বানারীপাড়া(বরিশাল)প্রতিনিধিঃ

অনন্তলোকে পাড়ি জমালেন ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান পদ্মবিভূষনে ভূষিত আধুনিক বাংলা কবিতার পুরোধা ব্যক্তিত্ব কবি শঙ্খ ঘোষ। বুধবার কলকাতায় নিজ বাসভবনে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন বানারীপাড়ায় আলো-ছায়ায় বেড়ে ওঠা সমকালীন বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান এ কবি। বুধবার (২১ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কলকাতার নিজ বাড়িতেই মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। তিনি ছিলেন জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতার পঞ্চপাণ্ডবের একজন। তার আগেই অনন্তের পথে পাড়ি জমান পঞ্চপাণ্ডবের অন্য চার কবি শক্তি-সুনীল-উৎপল ও বিনয়। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। তার ওপর গায়ে জ্বর থাকায় গত সপ্তাহে করোনা পরীক্ষা করে ১৪ এপ্রিল বিকেলে জানা যায়, তিনি করোনা পজেটিভ। কোভিড সংক্রমণ ধরা পরার পর ঝুঁকি না নিয়ে বাড়িতেই ছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে আচমকা তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। বুধবার সকালে তাকে ভেন্টিলেটরে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে চিরতরে চলে যান তিনি। প্রয়াত কবির স্ত্রী,এক মেয়ে এবং জামাইও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন৷ ফলে কবির প্রয়াণের খবর পেয়ে অনেকেই আবাসন চত্বরে জড়ো হলেও সবাইকেই কোভিড বিধি মেনে চলার জন্য অনুরোধ করা হয় শঙ্খ ঘোষের পরিবারের পক্ষ থেকে৷ ফলে দূর থেকেই প্রয়াত কবিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে হয় প্রত্যেককে৷ওই দিন দুপুরে নিমতলা মহাশ্মশানে শঙ্খ ঘোষের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুরে মামা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন কবি শঙ্খ ঘোষ। শঙ্খ ঘোষ এর প্রকৃত নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। তার বাবা মনীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং মা অমলা ঘোষ।  পৈতৃক নিবাস বরিশাল জেলার বানারীপাড়া পৌরসভার ৪ নাম্বার ওয়ার্ডে ঐতিহ্যবাহী ঘোষের বাড়িতে। শৈশব এবং কৈশোর এর অনেকটা সময় তিনি বানারীপাড়ায় কাটান। পিতা মনিন্দ্রভুষণ ঘোষের চাকরির সুবাদে তার শিক্ষা জীবন কাটে পাবনায়। সেখানকার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন।  পাবনা থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে কলকাতা চলে যান। ১৯৫১ সালে সেখানে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলায় কলা বিভাগে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। ১৯৯২ সালে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরগ্রহণ করেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে অধ্যাপনা করেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বছর দুয়েক আগে ‘মাটি’ নামের একটি কবিতায় মোদি সরকারের মুসলিমবিদ্বেষী নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন তিনি। শঙ্খ ঘোষ জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতায় যোগ করেন নতুন মাত্রা।  সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে নানা পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন শঙ্খ ঘোষ। ১৯৭৭ সালে ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থটির জন্য তিনি ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কার পান। ১৯৯৯ সালে কন্নড় ভাষা থেকে বাংলায় ‘রক্তকল্যাণ’ নাটকটি অনুবাদ করে ফের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়াও রবীন্দ্র পুরস্কার, সরস্বতী সম্মান, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১১ সালে তাকে পদ্মভূষণে সম্মানিত করে ভারতের তৎকালীন সরকার।

১৯৯৭ সালে কবি শঙ্খ ঘোষ তার পৈতৃক নিবাস বরিশালের বানারীপাড়ায় আসেন। নিজ ভিটে বাড়ি থেকে স্মৃতি হিসেবে এক টুকরো মাটি নিয়ে চলে যান কলকাতা। ২০১৯ সালে বাংলা একাডেমির আমন্ত্রণে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে কবি শঙ্খ ঘোষ ঢাকায় আসেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেবার আর বানারীপাড়ায় ফেরা হয়নি। একই বছর প্রকাশিত হয় কবি শঙ্খ ঘোষের গদ্য সংকলন- সন্ধ্যা নদীর জলে বাংলাদেশ। প্রসঙ্গত সন্ধ্যা নদীর তীরে কবির পৈতৃক নিবাস বানারীপাড়া উপজেলা অবস্থিত।  কবি শঙ্খ ঘোষের প্রয়ানে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ ভারতের শীর্ষ স্থানীয় কবি লেখক ও শিল্পীরা। এদিকে কবি শঙ্খ ঘোষের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নামে তার নিজ বাসভূমে  বানারীপাড়ায়। তার মহাপ্রয়ানে গভীর  শোক ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মোঃ শাহে আলম, সাবেক সংসদ সদস্য মো. মনিরুল ইসলাম মনি,বানারীপাড়া উপজেলা উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব গোলাম ফারুক,পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট সুভাষ চন্দ্র শীল,উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লা,কবির ভাতিজা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার তরুণেন্দ্র নারায়ণ ঘোষ,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য সাংবাদিক ও কলামিস্ট সোহেল সানি,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য  ও বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সুজন হালদার,বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট বানারীপাড়া উপজেলা শাখার সভাপতি ওয়াহিদুজ্জামান দুলাল,বানারীপাড়া প্রেসক্লাব সভাপতি রাহাদ সুমন,সাধারণ সম্পাদক সুজন মোল্লা প্রমুখ। এদিকে নিজের ভেরিফাইড ফেইসবুক একাউন্টে কবি শঙ্খ ঘোষের বানারীপাড়ার পৈত্রিক বাড়িতে ‘ কবি শঙ্খ ঘোষ স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানান বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিটিভির সাংবাদিক সুজন হালদার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here