হেফাজতের মামুনুল হককে নিয়ে চট্টগ্রামে টানটান উত্তেজনার।

0
5
মোঃ সিরাজুল মনির
চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব‍্যুরো:

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে ইসলামী দলগুলোর বিরোধীতার মধ্যেই হাটহাজারী আসার কথা হেফাজত ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক। তার হাটহাজারী আগমনকে প্রতিরোধের ঘোষণায় কদিন দিন ধরে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে পুরো চট্টগ্রামজুড়েই। তবে শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার মধ্যরাত ও শুক্রবার সকালে পরপর দুদফা ঢাকার নির্দেশনা পেয়ে ঘোষণা দিয়ে প্রতিরোধ হুঙ্কার ছড়ালেও ঘরে ঢুকে যেতে বাধ্য হয়েছে চট্টগ্রামের ছাত্রলীগের নেতারা।

রাতভর ফেসবুকে উত্তেজনা ছড়ালেও ভোর হতেই তা নিমিষেই শেষ হয়ে গেছে। কেননা সংগঠনটির সভাপতির কড়া নির্দেশনার পর মামুনুল হক বিরোধী কর্মসূচিশুধু স্থগিত করা হয়েছে তা নয়। যাকে নিয়ে এতো আলোচনা-উত্তেজনা সেই মামুনুল হক সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সড়কপথে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় এসে পৌঁছেছে বলে দায়িত্বশীল একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। মূলত কোনও ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতেই সরকারের প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শে হেফাজত নেতারা মামুনুল হককে সড়কপথে সকাল সকাল নিয়ে আসেন। তিনি বর্তমানে হাটহাজারী মাদ্রাসায় বিশ্রামে রয়েছেন।

অথচ গতকাল বৃহস্পতিবারও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সমাবেশের পাশাপাশি ফেসবুকজুড়ে ব্যাপক প্রতিরোধের ঘোষণা এসেছিল ছাত্রলীগ নেতাদের কাছ থেকে। সম্প্রতি ভাস্কর্য নিয়ে মাওলানা মামুনুল হকের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গন। হাটহাজারী পার্বতী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আল আমিন সংস্থার তিনদিনব্যাপী তাফসিরুল কোরআন মাহফিলের শেষ দিনে শুক্রবার (২৭ নভেম্বর) সন্ধ্যার পর মাহফিলে বক্তব্য রাখবেন তিনি।

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল ইউনিটের শীর্ষ এক নেতা বলেন, ‘রাত ১২টার পর ছাত্রলীগের সভাপতি আমাদের ফোন করে সরকারের নির্দেশনায় আছে জানিয়ে মামুনুল হকের বিরুদ্ধে কোনও ধরণের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে নিষেধ করেছেন। এরপরও আমরা যেহেতু ঘোষণা দিয়েছি সকাল ১০ টার পর  বিষয়টি নিয়ে আবার কথা বলে কর্মসূচি স্থগিত করব কি না তা জানাতে পারব।’ পরে শুক্রবার সকালে ওই নেতা বলেন, ‘কর্মসূচি স্থগিতই রাখা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে কড়া নির্দেশ রয়েছে।’

মামুনুল হকের আগমনকে ঘিরে হাটহাজারী ঘিরে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কঠোর প্রস্তুতি। মাহফিলে মামুনুল হক সরকারবিরোধী যেন কোনো বক্তব্য না দেন সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাহফিল পরিচালনা কমিটির সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

এদিকে ভাস্কর্য মূর্তি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পর বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে নগর ছাত্রলীগের নেতারা। সমাবেশ থেকে মামুনুল হক কে প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়া হয়। পাশাপাশি হাটহাজারীতে উপজেলা যুবলীগ ছাত্রলীগ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করবেন বলে ইতিমধ্যে উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হুদা মনি ঘোষণা দিয়েছেন।

তবে মাহফিল কর্তৃপক্ষ ও হেফাজত নেতারা বলছেন, মাওলানা মামুনুল হক মাহফিলে উপস্থিত হয় সন্ধ্যার পরে বক্তব্য রাখবেন। মামুনুল হক মাহফিলে আসবেন এবং মাহফিলে বক্তব্য রাখবেন। হেফাজতের দায়িত্বশীল একনেতা বলেন, ‘আমাদের মাহফিলে মামুনুল হকের আগমন ঠেকাতে আওয়ামী লীগের নেতারা যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে তা সরকারের হাই কমান্ড অবগত। ইতোমধ্যে তারা সুষ্ঠুভাবে মাহফিল পরিচালনা করতে সব ধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তাই কে কি ঘোষণা দিল সেটা নিয়ে আমরা বিচলিত নই। মামুনুল হক আসবেন এবং বক্তব্য দিবেন এটাই ফাইনাল।’

এদিকে মাহফিলকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। শুক্রবার সকাল থেকে হাটহাজারী পৌরসভা ও এর আশপাশের এলাকায় পুলিশের ২৫টি টিম সহ বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। চট্টগ্রাম বিমান বন্দরসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সিএমপির পুলিশও। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবস্থার নিচ্ছেন পতেঙ্গা থানার ওসি জোবায়ের সৈয়দ। তিনি বলেন, ‘মামুনুল হক বিমানবন্দর দিয়ে আসবেন কিনা আমরা জানিনা। এরপরও যে কোনও ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আমরা এয়ারপোর্টে সতর্ক অবস্থানে আছি।’

এ বিষয়ে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ‘হাটহাজারীতে অনুষ্ঠিত মাহফিলে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক আগমনের বিষয়ে সেটা তাদের বিষয়ে। তবে মাওলানা মামুনুল হকের বিষয়ে আমরা মাহফিল কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠক করার চেষ্টায় আছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা প্রস্তুত রয়েছি।’

হাটহাজারী মডেল থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাহফিলকে কেন্দ্র করে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অতিরিক্ত পুলিশসহ বিপুল পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন আছে।’

হাটহাজারী পৌরসভা সদরের পার্বতী মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গত ২৫ নভেম্বর থেকে তিন দিনব্যাপী ‘তাফসীরুল কুরআন মাহফিল-২০২০’ আয়োজন করেছে ‘আল আমিন সংস্থা’ নামের একটি সংগঠন। প্রতি বছর শীতে সংস্থাটি এই মাহফিলের আয়োজন করে। সংস্থার ব্যানারে হলেও আয়োজকরা হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতাকর্মী ও স্থানীয় আলেমরা এই সংগঠনে রয়েছে।

মাহফিলে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা এবং হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আল আমিন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ শুক্রবার সকাল ৯ টার দিকে  বলেন, ‘আমি খুবই অসুস্থ এই বিষয়ে আমি এখন কিছু বলতে পারব না।’

শুক্রবার (২৭ নভেম্বর) এই মাহফিলে প্রধান দুই বক্তার একজন হলেন প্রয়াত শাইখুল হাদিস আল্লামা আজীজুল হক’র পুত্র হেফাজতের নবগঠিত কমিটির যুগ্ন মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক। অন্যজন হলেন মাওলানা জুনাইদ আল-হাবীব। শুক্রবার সমাপনী দিনে প্রধান অতিথি হিসেবে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরীর উপস্থিত থাকবেন। গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার ওই মাহফিলের কার্যক্রম চলছিল বিদ্যালয়ের মাঠে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা মামুনুল হক সদ্য ঘোষিত হেফাজতে ইসলামের কমিটিতে যুগ্ম মহাসচিবের পদ পেয়েছেন। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাজধানী ঢাকার বিএমএ মিলনায়তনে ধোলাইরপাড়ে জাতির পিতার ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে তা অবিলম্বে বন্ধের দাবি তোলেন মামুনুল হক।

তার ওই বক্তব্যের পর এখন পযন্ত সরকার বা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তেমন কোনো প্রতিবাদ লক্ষ করা যায়নি। তবে জেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করছেন।

হাটহাজারীতে মাওলানা মামুনুল হক আসার বিষয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইদ্রিস বলেন, মাওলানা মামুনুল হক হাটহাজারীর মাহফিলে বক্তব্য দেয়ার বিষয়ে কেউ নিষেধ করেন নি এবং সরকারের পক্ষ থেকেও নিষেধ করা হয়নি। তিনি আসবেন এবং মাহফিলে বক্তব্য রাখবেন। এতে যদি কেউ বাধা প্রদানের চেষ্টা করে তখন বিষয়টি দেখা যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here