ছেলেবেলার পাকশীকে নিয়ে লেখা ছোট গল্প “বাতাসী” সনজু খান

0
15
স্টাফ রিপোর্টারঃ-
ছেলেবেলার পাকশীকে নিয়ে অনেক কথা লিখেন বিশিষ্ট শিল্পপতি,লেখক,সমাজ সেবক আকরাম আলী খান সনজু তার একটি লিখা পাঠক দের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।
“বাতাসী”
সেই অসমাপ্ত ক্যানভাস! ধূলো পড়া ক্যানভাসের মাঝে ফুটে আছে কোন এক চিরচেনা শহরে শৈশব, কৈশোর, যৌবনের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি।পুরনো ক্যানভাসটির সামনে দাঁড়াতেই শরীরের ভেতর শিঁউরে উঠে ক্রিয়ল রক্তের পাগলামি। এ যেন জলের আয়নায় হারিয়ে যাওয়া এক অসমাপ্ত প্রেমের প্রতিচ্ছবি। ক্যানভাসের মাঝে লাল রং তুলির আঁচড়ে রঙিন ছেলেবেলার পাকশীর ইনস্টিটিউট। সেখানে মঞ্চস্থ হয়েছিল জগৎ বিখ্যাত সেক্সপিয়ারের নাটক। মুখরিত হতো অপূর্ব সব রমণীরা। সেখানেই ঘটে দৃষ্টিপাত, ফোটে পদ্ম। লাল ইটের দেওয়ালে আছড়ে পরে হাসির দ্যুতি, বিস্মিত হয় আমিয়। কতো নাটক, কতো গান, কতোই না সংস্কৃতি সন্ধ্যা।
সেদিন ছিল রোববার। ইনস্টিটিউটি ছিল উৎসবমুখর। মস্ত বড় স্টেজ। স্টেজের পাশেই একটা থাম। অনুষ্ঠান দেখতে তুমি সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলে কাল তাঁতের শাড়ি পড়ে। স্টেজে যাই ঘটুক, সবার দৃষ্টি ছিল থামের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো তোমার দিকে। পনের বছরে তনুশ্রী শাড়িতে যেমন খোলে, অন্য পোশাকে তেমন নয়। তোমার দিকে চোখ পড়তেই, তোমার চোখের চঞ্চল দ্যুতি আমায় আলোড়িত করে তুলে। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অন্ধকারে নদীর চরে পৌঁছেছিলাম। শুনশান নিরবতার মাঝে চাঁদের আলোয় ভাসিয়ে দিলে তোমার শরীর। দুহাত প্রশস্ত করে হেঁটে চলেছিলে বালির উপর। হঠাৎ চোরাবালির মাঝে তোমার পা দুটো আটকে গেলো। তুমি ভয় পেয়ে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলে ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না তোমার উষ্ণ স্পর্শে পৌঁছতে পেরেছিলাম। সেই চাঁদের আলোয়, নদীর চরের মাঝে এই অল্প বয়সী নর-নারীর অঙ্গাঙ্গী ছায়া কেউ দেখতে পেয়েছিল কিনা, কে জানে! হয়তো কেউ দেখেও দেখিনি!
কালো তাঁতের প্রথম শাড়ি পরা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। শাড়িটি সামলাতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল তোমার। তবুও তুমি তোমার নারীত্ব ফুটিয়ে তুলতে কি সেই আপ্রাণ চেষ্টা। আমার দু’নয়নে জ্বলেছিল তোমার দেহের চন্দ্রালোকিত  আলো। যেন চন্ডীদাসের রাধা সরোবরময়ী,
“লাবণ্য জল তোমার সিহাল কুন্তল
বদন কমল শোভে অলক ভষল”।
এরপর পড়ালেখার জন্য তোমাকে ছেড়ে আসতে হয়েছিল আমার। হেমন্তের কোন এক দুপুরে তোমার চিঠি। চিঠি দেখেই বুঝতে পেরেছি, আমার অভাবটা তুমি প্রতিমুহূর্ত অনুভব করছো। বিশেষ যত্ন নিয়ে তোমার চিঠিটা খুলেছিলাম। চিঠিতে তেমন কিছুই লিখনী তুমি। শুধু তুমি তোমার স্বপ্নের কথা লিখেছিলে।
স্বপ্নে দেখেছিলে মস্ত বড় বাড়ি। কম্পমান মায়াবী আলোয় ঘরের সিঁড়ি, সর্বত্র পালিশ করা পিতলের বাতিদানে অগ্নি শিখা। বাড়িটির নাম রেখেছিলে বাতাসী। দখিনা হাওয়ায় স্বপ্নপুরী বাড়িটি যেন প্রানবন্ত হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ দিকের বারান্দায় আমাকে একা রেখে সন্ধ্যাস্নান করে আসলে। মৃদু কোলনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল সারা বাড়িময়। বাসন্তী রঙের তাঁতের শাড়িতে বারান্দায় গলে পড়া চাঁদের আলোয় কি অপূর্বই না দেখাচ্ছে তোমাকে। বাতাসে ক্রমাগত তোমার ঘন কালো কেশ উড়তে থাকলো। অনাবৃত শাড়ির আঁচলে তোমার ঐশ্বর্যের আলিঙ্গন দেখে ভেবেছিলাম, আমি ছাড়া পৃথিবীতে এই ঐশ্বর্যের যোগ্য আর কেউ হতে পারে না।
এর বছর চারেক পেরুতেই কোন এক সর্বগ্রাসী সম্পর্কের হাতছানি। সর্বনাশের বীজ যে এরইমধ্যে অঙ্কুরিত হয়েছে, তা মোটেও জানা ছিল না। এই বীজের শিকড় মনের গহনে বিপদজনক প্রদেশের ছড়িয়ে পড়ল। নিজের হাতে চূর্ণবিচূর্ণ করেছি তোমার সেই বাতাসীর পিতলের বাতিদান। মনের মাঝে যতটা না ছিল ভালোবাসা, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল নিজের অনিশ্চয়তা, ঈর্ষা, ক্ষোভ, ঘৃণা। তবুও মনের অজান্তে বলে উঠি,
“জানি হে তুমি মম, জীবনে শ্রেয়তম
এমন ধন আর নাহি, যে তোমা-সম”।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here